১১:৪৬ পি.এম
মানুষের জীবনে সুখ এবং স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি দুঃখ, বিপদ এবং বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা এসে পৌঁছে। এটি পার্থিব জীবনের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। ইসলাম শিক্ষা দেয় যে, সুসময়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে এবং দুঃসময়ে ধৈর্য ধরে নামাজ, দোয়া এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁর সাহায্য সম্পর্কিত প্রার্থনা করতে হবে। একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে, জীবনের প্রতিটি ঘটনা আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী ঘটে এবং প্রতিটি পরীক্ষার মধ্যেই কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত থাকে। পবিত্র কুরআন ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ আমাদের ধৈর্য, তাওয়াক্কুল এবং দোয়ার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করার সর্বোত্তম দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে। একজন মুমিন বিশ্বাস করেন যে, বিশ্বজগতে আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো কিছুই সংঘটিত হয় না। তাই সুখে যেমন আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জানান, তেমনি দুঃখ-কষ্টের সময় তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করতে হয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
আরও পড়ুন: ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের প্রশিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ শুরু
‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৩)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বিপদের সময় ধৈর্য এবং নামাজের মতো দুটি শক্তিশালী অবলম্বনের কথা উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহর জিকির হৃদয়ের প্রশান্তির উৎস। যেমন শরীরের জন্য খাদ্য প্রয়োজন, তেমনি আত্মার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর স্মরণ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
আরও পড়ুন: দুদক হারুনের বিরুদ্ধে দুই মামলায় চার্জশিট দিয়েছে
‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫২)
আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা আর-রাদ: আয়াত ২৮)
আরও পড়ুন: বিএনপি ক্ষমতায় আসলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হতে পারে না
ধৈর্য মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। ইসলামে ধৈর্য কেবল বিপদে নীরব থাকা নয়; বরং আল্লাহর বিধানের ওপর অটল থাকা, ইবাদতে অবিচল থাকা এবং পাপ থেকে নিজেকে বিরত রাখাও ধৈর্যের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
‘ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নেয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (বুখারি ১৪৬৯, মুসলিম ১০৫৩)
মুমিনের প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। সুদিনে শুকরিয়া, দুর্দিনে ধৈর্যই একজন মুমিনের শক্তি। সুদিন এবং দুর্দিন—উভয় অবস্থায় মুমিনের জন্য কল্যাণ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
আরও পড়ুন: প্রধান বিচারপতির এজলাসে আইনজীবীর আচরণ অনুচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত : আইনমন্ত্রী
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ...
‘মুমিনের অবস্থা সত্যিই বিস্ময়কর। তার প্রতিটি বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ পেলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে— এটি তার জন্য কল্যাণকর। আর দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হলে ধৈর্য ধারণ করে— এটিও তার জন্য কল্যাণকর। আর এই সৌভাগ্য কেবল মুমিনেরই।’ (মুসলিম ২৯৯৯)
বিপদের সময় রাসুল (সা.)-এর শেখানো দোয়া হলো—
শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষার দোয়া
আরও পড়ুন: লেবার নেতা করবিনের দাবি, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সামরিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা হোক
اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাঝআলুকা ফি নুহুরিহিম ওয়া নাউজুবিকা মিন শুরুরিহিম।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমরা তাদের মোকাবিলায় তোমাকেই আমাদের রক্ষাকবচ বানাচ্ছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে তোমার আশ্রয় চাই।’ (আবু দাউদ ১৫৩৭)
বিপদে পড়লে পড়ার দোয়া হলো—
আরও পড়ুন: নতুন প্রকল্পে সব জেলায় পৌঁছাচ্ছে রেল, বাড়ছে কোচ-লোকোমোটিভ
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا
উচ্চারণ: ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাঝিউন, আল্লাহুম্মা ঝুরনি ফি মুসিবাতি ওয়াখলিফলি খাইরাম মিনহা।’
অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এ বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং এর পরিবর্তে আমাকে আরও উত্তম কিছু দান করুন।’ (মুসলিম ৯১৮)
দোয়া ইউনুস (আ.) হলো—
لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ: ‘লা ইলাহা ইল্লা আংতা সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বলিমিন।’
অর্থ: ‘আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা আল-আম্বিয়া: আয়ত ৮৭)
এ দোয়ার ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, যদি কোনো মুসলিম এই দোয়া করে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তা কবুল করেন। (তিরমিজি ৩৫০৫)
কঠিন কাজ সহজ হওয়ার জন্য দোয়া হলো—
اللَّهُمَّ لَا سَهْلَ إِلَّا مَا جَعَلْتَهُ سَهْلًا، وَأَنْتَ تَجْعَلُ الْحَزْنَ إِذَا شِئْتَ سَهْلًا
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা লা সাহলা ইল্লা মা ঝাআলতাহু সাহলান, ওয়া আংতা তাঝআলুল হাযনা ইজা শিই’তা সাহলান।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি যা সহজ করেন, তা ছাড়া কোনো কিছুই সহজ নয়। আর আপনি চাইলে কঠিন বিষয়কেও সহজ করে দেন।’ (ইবন হিব্বান ৯৭৪)
বিপদ মুমিনের গুনাহ মাফের কারণ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ... حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
‘মুসলমানের যে কোনো কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, পেরেশানি, এমনকি শরীরে একটি কাঁটা বিঁধলেও আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন।’ (বুখারি ৫৬৪১–৫৬৪২, মুসলিম ২৫৭৩)
ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর সুসংবাদ হচ্ছে—
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ১০)
আরও ইরশাদ হয়েছে—
سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا
‘অচিরেই আল্লাহ কষ্টের পর স্বস্তির ব্যবস্থা করে দেবেন।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ৭)
এবং—
وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا أَصَابَكَ ۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
‘তোমার ওপর যে বিপদ আসে, তাতে ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই এটি দৃঢ়সংকল্পের কাজ।’ (সুরা লুকমান: আয়াত ১৭)
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। কখনো তিনি সুখ দিয়ে বান্দার কৃতজ্ঞতা যাচাই করেন, আবার কখনো দুঃখ দিয়ে তাঁর ধৈর্য ও ইমানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করেন। একজন মুমিনের পরিচয় হলো—তিনি সুদিনে আল্লাহকে ভুলে যান না এবং দুর্দিনে তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হন না। নামাজ, দোয়া, জিকির, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে বড় শক্তি। যে ব্যক্তি সব অবস্থায় রবের ওপর নির্ভর করে, আল্লাহ তাকে কখনো একা ছেড়ে দেন না। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত সুখে-দুঃখে, প্রাচুর্যে-অভাবেও আল্লাহর প্রতি আস্থা অটুট রাখা এবং তারই সন্তুষ্টি অর্জনের পথে অবিচল থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ এবং তাওয়াক্কুলকারী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন