১০:৩৪ পি.এম
গাজীপুর, ৮ আগস্ট, ২০২৬ : ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম মন্তব্য করেন, কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে প্রাণ ফিরেছে। একইসঙ্গে গুগল-মেটা ও টিকটকের কাছ থেকেও বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
আজ শনিবার গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক পরিদর্শনকালে মন্ত্রী এ কথা বলেন। দেশের প্রথম এই হাই-টেক পার্কের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ সরেজমিনে দেখতে সেখানে যান মন্ত্রী।
এই পরিদর্শন সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অগ্রগতির একটি অংশ। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে আইসিটি খাতে সফটওয়্যার, অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার শিল্পে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যাওয়া এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় পণ্যকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করার অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের প্রশিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ শুরু
এ প্রসঙ্গে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী জানান, নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে ‘ন্যাশনাল গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি’ বাস্তবায়ন এবং এআই হাব ও সফটওয়্যার-অ্যাপ-হার্ডওয়্যার উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের জন্য ফিসকাল ও নন-ফিসকাল প্রণোদনার প্রস্তাবনাও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
মাহবুব আনাম স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দেশে প্রথম ‘আইসিটি পলিসি-২০০২’ প্রণয়নের ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কালিয়াকৈরে ২৩১.৬৫ একর জমিতে হাই-টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১৬ সালে আরো ৯৭.৩৩ একর জমি যুক্ত করা হয়। বর্তমানে পার্কের মোট আয়তন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭১ একর।
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আরও বলেন, মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের পর দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোকে জমি ও রেডি স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সফটওয়্যার, অ্যাপ, হার্ডওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে এ পর্যন্ত মোট ৮৫টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বা স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ৭টি রয়েছে। ইতোমধ্যে ৪০টি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে, ২৮টি নির্মাণাধীন এবং ১৭টির শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হবে।
আরও পড়ুন: দুদক হারুনের বিরুদ্ধে দুই মামলায় চার্জশিট দিয়েছে
পার্কে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ প্রায় ১.৬৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২৮৩ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা)। এ পর্যন্ত সরকার মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করেছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি। ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম যথাযথভাবে গড়ে তোলা গেলে পার্কটি থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলেও মন্ত্রী জানান।
বিদেশি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট প্রায় ৬২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। ফলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক কেবল দেশীয় প্রযুক্তি উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং ভবিষ্যতে বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানির উৎপাদন, সংযোজন, গবেষণা-উন্নয়ন ও রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ও হাব হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এখন পার্কটিতে ৩টি মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী (অনর, শাওমী প্রভৃতি), ২টি ল্যাপটপ উৎপাদনকারী, ১টি এটিএম ও ক্যাশ রিসাইকেলার মেশিন উৎপাদনকারী, ৬টি ফাইবার অপটিক্যাল কেবল উৎপাদনকারী এবং ৩টি গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান (হুন্দাইসহ) কাজ করছে।
এ ছাড়া আইওটি ডিভাইস, রাউটার, সুইচ, সিসিটিভি, এসি, রেফ্রিজারেটর, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন, কিওস্ক ও এটিএম মেশিনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: বিএনপি ক্ষমতায় আসলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হতে পারে না
ডেটা সেন্টার স্থাপনের কাজ করছে ২টি কোম্পানি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানির প্রস্তাবিত এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পে গুগল, মেটা (ফেসবুক) ও টিকটক সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন রয়েছে।
বিনিয়োগবান্ধব নীতির প্রণয়নের প্রশ্নে মাহবুব আনাম জানান, হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক-কর সুবিধা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সেবায় ভ্যাট সুবিধা, হাই-টেক পণ্যের তালিকা সম্প্রসারণ এবং ম্যানুফেকচারের পাশাপাশি অ্যাসেম্বলরদেরও সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
বিশেষ করে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে কাঁচামালের শুল্ক-কর রেয়াত, স্থিতিশীল আয়কর সুবিধা এবং ইভি ব্যাটারি, সোলার ব্যাটারি, ইউপিএস ব্যাটারি, ই-বাইকের মতো নতুন প্রযুক্তি খাতের জন্য পৃথক প্রণোদনা কাঠামো তৈরির প্রস্তাবও তৈরি করা হচ্ছে।
অবকাঠামোগত সক্ষমতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমেয় নীতিগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগের গতি আরো বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে দেশে প্রযুক্তিপণ্যের স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে, বলেও তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুন: ভবানীগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের গ্রাহকদের সঙ্গে আলোচনা সভা
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর এই পরিদর্শন দেশের হাই-টেক শিল্পের বর্তমান অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, উৎপাদন ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এ সময় কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ফজলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাগণও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে কালিয়াকৈরের ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশ (ইউএফটিবি)-এ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী।
আরও পড়ুন: প্রধান বিচারপতির এজলাসে আইনজীবীর আচরণ অনুচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত : আইনমন্ত্রী
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন