১১:১২ পি.এম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার সূচনা করার আগে ঘোষণা করেছিলেন, যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি হলো বিশ্বের জন্য একটি অনিবার্য হুমকি। দীর্ঘ চার মাসের যুদ্ধ চলার পর, ট্রাম্প হঠাৎ করে সম্পূর্ণ বিপরীত সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে তিনি বারবার দাবি করেছেন, এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে অনেক বড় একটি সফলতা, কারণ ইরানকে সম্পূর্ণ পরমাণুমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পরমাণু সামগ্রী এখন এত গভীর মাটির নিচে বা পাহাড়ের খাদে চাপা পড়েছে, যে সেগুলো উদ্ধার করা মানুষের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। মার্কিন স্যাটেলাইটগুলো ওইসব জায়গাগুলোতে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে, যার ফলে ইরানের পক্ষে আবার কখনও পরমাণু অস্ত্র তৈরির সুযোগ নেই। এমনকি এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি দাবি করেন, পরোক্ষভাবে ইরানের পরমাণু সামগ্রী এখন আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আমেরিকার বাইরে অন্য কেউ সেখানে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে না।
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এসব দাবির কোনও যুক্তিপূর্ণ ভিত্তি নেই এবং এগুলো সম্পূর্ণ স্ববিরোধী। যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, তিনি দাবি করেছিলেন, ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশের পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা মোটেও অবশিষ্ট নেই। যদি এটাই সত্যি হয়, তবে ঠিক দুই সপ্তাহ পর ফেব্রুয়ারিতে আবার কোন অনিবার্য হুমকির কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে।
আরও পড়ুন: বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নিয়ে নতুন আলোচনা, ফখরুলের সঙ্গে আরও একটি নাম এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
এই যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পরমাণু সামগ্রী মার্কিন হেফাজতে আনা এবং তেহরানকে একটি কঠোর স্থায়ী চুক্তিতে বাধ্য করা, যাতে তারা ভবিষ্যতে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। গত ৭ এপ্রিল প্রথম যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে, গত তিন মাস ধরেই মার্কিন প্রশাসন একটি পরমাণু চুক্তির জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যদি মাটির নিচে পারমাণবিক সামগ্রী চাপা পড়াই যথেষ্ট হয় এবং ইরান ইতিমধ্যে পরমাণুমুক্ত হয়ে থাকে, তবে কেন গত তিন মাস ধরে ওয়াশিংটন চুক্তির জন্য সময় ও অর্থ ব্যয় করেছে? ট্রাম্পের এই স্ববিরোধী বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যায়, যুদ্ধের সূচনা এবং এর ধারাবাহিকতা– সবকিছুই ছিল এক মিথ্যা অজুহাতের ভিত্তিতে।
ব্যর্থতা ঢাকতেই কি এই নতুন চাল?
প্রকৃত ঘটনা হলো, ইরানের সঙ্গে কোনো কার্যকরী চুক্তি করা ট্রাম্পের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তিনি নিজেই বুঝতে পারছেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন জনগণের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক অবস্থান আরও সংকটের মুখে পড়বে।
সুতরাং, কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে প্রত্যাহার করার জন্য তিনি আজ থেকেই প্রস্তুতি করছে। তিনি মার্কিন জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, আমেরিকা যুদ্ধে জয়ী হয়েছে এবং যুদ্ধের শুরুতেই যে উদ্দেশ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা অর্জিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানের বাদাখশানে বেড়েছে সোনা উত্তোলনের কাজ
যুদ্ধের পরিণতির বিষয়টি হলো, এটি শুধু ক্ষতির কারণ। ট্রাম্প তাঁর এই সামরিক অভিযানকে বিশাল সাফল্য হিসেবে প্রচার করলেও, বাস্তবে এই যুদ্ধের ফলাফল বিশ্বের জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও ক্ষতিকর হয়েছে। এই অর্থহীন সংঘাতের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র ধাক্কা এবং মন্দার মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এছাড়া, বড় ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ হলো, এই যুদ্ধের ফলে ইরান শক্তি প্রদর্শন করেছে। তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়েছে, যা আগে কখনো এত স্পষ্ট ছিল না। হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের একক আধিপত্য মধ্যপ্রাচ্য ও গোটা বিশ্বের তেল বাণিজ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করেছে। এর ফলে, ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কৌশলগত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি, বরং এটি বিশ্বকে একটি চরম অর্থনৈতিক এবং সামরিক অনিরাপত্তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ডেইলি দি ক্রাইম/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন